মন বুড়ো হয়নি — মো রেজাউল হক

Anonymous



মধ্যবয়স্ক এক পুরুষ ঠোঁটের কোণে বিস্তর এক হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরছে।হাতে বাদামের প্যাকেট। ফুরফুরে মেজাজে কলিং বেল বাজালো। কাজের মেয়ে সুমি দরজা খুলে দিয়ে সালাম ঠুকলো শোয়েব আহমেদকে। মুখের হাসি বজায় রেখে সালামের উত্তর নিলেন তিনি।ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে চারপাশে তাকালেন। জিজ্ঞাসা করলেন "আমার ছানাগুলো কোথায়?"
শোয়েব আহমেদের কথা বলার ধরন দেখে কু*টিকুটি করে হেসে ফেলে সুমি। উনি বরাবরই রসিক প্রকৃতির মানুষ।যার দরুন তার কথাতে সবসময় রসিকতা লেগে থাকে। হেসেই বলে "আপায় তো পড়তাছে খালু্। আর ভাইজান বন্ধু বান্ধব গোর লগে কুন জাগাত গেছে।"
সুমির কথা শুনে মাথা নাড়লেন শোয়েব আহমেদ। তারপর আবার প্রশ্ন করলেন- "তা আমার রানী সাহেবা কই?"
"রুমে আছে। নামাজ পড়তাছে দেইখা আইলাম।"
"আচ্ছা তুই যা। তোর আবার সিরিয়াল শুরু হয়ে গেলো কি না দেখ।"
সুমি আরেক চোট হাসে। চলে যেতে নিয়ে আবার বলে, "খালু আপনারে চা বানাইয়া দিমু?"
"না থাক। এখন আর চা খাবো না। তুই যা।"
সুমি মুচকি হেসে চলে গেলো। শোয়েব আহমেদও রুমের দিকে পা বাড়ালেন।

নামাজ শেষ করে জায়নামাজ গুছিয়ে রাখছিলেন খাদিজা বেগম। এর মধ্যেই শোয়েব আহমেদের আগমন ঘটে। ঠোঁটে হাসি রেখে বলে উঠে - "দেখো তোমার জন্য কী এনেছি?"
খাদিজা বেগম একবার স্বামীর ধরে রাখা প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে তারপর উনার দিকে তাকিয়ে বললেন, "টেবিলে রাখেন।"
শোয়েব সাহেব আকাশ থেকে পড়লেন যেনো। অবাক মুখভঙ্গি নিয়ে বললেন- "ব্যস? এই? আমি যে তোমার জন্য এতো কষ্ট করে বাদাম নিয়ে এলাম। এর কোনো দাম নেই?"
খাদিজা বেগম ভাবলেশহীন ভাবে বললেন, "কতো দিয়ে এনেছেন বলেন? দাম দিয়ে দিচ্ছি।"
এবার অবাক হওয়ার সাথে একটু রাগ হলেন শোয়েব সাহেব। মুখোবয়ব গম্ভীর করে বলেন-
"আমি ভালোবেসে তোমার জন্য তোমার পছন্দের জিনিস এনেছি। তোমার উচিত লজ্জা পাওয়া। খুশিতে আটখানা হয়ে যাওয়া। ধন্যবাদ দিতে দিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলা।"
খাদিজা বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে বলেন, "আচ্ছা আপনি কী ভুলে যান আমাদের যে বয়স হচ্ছে। আমাদের কলেজ ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেমেয়ে আছে। এই বয়সে এসে আজগুবি কাজকারবার করছেন। প্রতিদিন এটা সেটা নিয়ে ফেরেন।আমি আগের সেই তরুণী মেয়েটি নেই যে লজ্জাবতী লতা হয়ে থাকবো। এতো বছর আপনার সাথে সংসার করেছি, দুই সন্তানের মা হয়েছি। এখন আমাদের আর এসবের বয়স আছে?"
ফোঁস করে শ্বাস ছাড়লেন শোয়েব সাহেব। মাঝে মধ্যে তিনি বুঝে উঠতে পারেন না তার মতো এমন রোমান্টিক রসিক মানুষের সাথে এমন আনরোমান্টিক রসকসহীন মানুষ জুটলো কী করে। কী করে তিনি এই রসকসহীন মহিলাকে ভালোবেসে ফেললেন। সংসার করলেন, বাবা হলেন কিন্ত অনুভূতি এখনো আগের মতো তাজা আছে। ভালোবাসা এক চুল কমে নি বরং সময়ে সাথে বেড়েছে।এই রসকসহীন মহিলাকেই আনন্দ দিতে সারাক্ষণ রসিকতা করেন। তার কী খেতে ভালো লাগে অফিস থেকে ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসেন ঠিক আগের মতোই।কোনো কিছুর পরিবর্তন হয় নি। তাকে খুশি থাকতে দেখলে যে শোহেব সাহেব ভীষণ সুখ পান, শান্তি পান। তার খুশির জন্যই তো এতো কিছু। অথচ মানুষটাই সেটা বুঝে না। অভিমানের চাপ পাওয়া গেলো শোয়েব সাহেবের চোখে মুখে। শরীর বুড়ো হলেও মন বুড়ো হয় নি। তাই এখনো স্ত্রীর সাথে তার আচার আচরণ সেই যুবক শোহেব আহমেদের মতোই।

খাবার টেবিলে সবাই এক সঙ্গে খেতে বসেছে। শাহানা আর শাহিদ শোহেব আর খাদিজার দুই সন্তান। শাহিদ এবার অনার্স তৃতীয় বর্ষে আর শাহানার ইন্টার পরীক্ষা দিবে। সবাই ঠিক কিন্তু শোয়েব সাহেবের মুখ ভার।
হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন-
" শাহানা মামনি, তুমি আজকে বাবাকে খাবার বেড়ে দাও।"
উনার কথায় সবার দৃষ্টি পড়লো উনার ওপর। খাদিজা বেগম ভ্রু কুচকে তাকিয়ে আছে স্বামীর দিকে। শাহানা অবাক হয়ে একবার মাকে দেখে তো একবার বাবাকে।পাশ থেকে শাহিদ ফিসফিস করে বলে-
"আবার হয়তো টোনাটুনির মান অভিমান হয়েছে।"
ভাইয়ের কথা শুনে ফিক করে হেসে উঠলো শাহানা।ভাত বেড়ে দিলো বাবাকে।
খেতে খেতে শোহেব সাহেব বলেন, "বুঝলে শাহিদ, দুনিয়া থেকে মায়া মহব্বত সব উঠে গেছে। আজকাল মানুষ মানুষকে দু আনার দাম ও দেয় না।"
কথাটা বলে আড়চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন তিনি। খাদিজা বেগম মুখে ভেঙচি কেটে  বিড়বিড় করে বলে-
"ভাব দেখলে বাঁচি না।"
শুনে ফেললেন শোহেব সাহেব বললেন-
"বিরবির করছো কেনো? তোমাকে তো কিছু বলিনি।"
"আমি কচি খুকি না যে কে কাকে কি বলে তা বুঝবো না।"
শোহেব সাহেব শাহানার দিকে তাকিয়ে বলে "তোমার মাকে চুপ করতে বলো। আমি কিন্তু খাবো না।"
শাহানা কনফিউজড হয়ে বলে, "কিন্তু বাবা তোমার তো খাওয়া শেষ।"
শাহিদ ঠোঁট কা*মড়ে ধরে আছে, কিছুতেই হাসা যাবে না এখন। শোহেব সাহেব নিজের প্লেটের দিকে তাকান, প্লেট খালি। আবার সবার দিকে তাকান। হাল্কা কেশে হাত ধুতে চলে যান। শাহিদ এবার হু হা করে হেসে উঠলো।তাল মিলালো শাহানা আর খাদিজাও।

রাত ১২:৫০
সবাই ঘুমিয়ে গেছে। এই সময় শোহেব সাহেব খাদিজাকে ঘুম থেকে টেনে তুললেন। চূড়ান্ত বিরক্ত হয়ে খাদিজা বলে-
"আপনার সমস্যা কী? ঘুমাতে দিবেন না নাকি? রাত বিরেতে এমন করছেন কেন?"
শোহেব সাহেব উৎফুল্ল হয়ে বলে, "বাহিরে তাকিয়ে দেখেছো বিশাল চাঁদ উঠেছে। চারিদিকে কী চমৎকার আলো। চলো দুজনে নদীর পাড়ে যাই। চন্দ্রবিলাশ করে আসি।"
ঘুম উড়ে গেলো খাদিজার। চরম অবাক হয়ে বলে_
"আপনার মাথা টাথা কী গেছে? নিজে এক পাগল আমাকেও তার সামিল করতে চান? আপনার এতো ইচ্ছে হলে আপনি যান, আমি বাবা এর মধ্যে নেই।"
খাদিজা আবার ঘুমাতে গেলে শোহেব সাহেব আবার টেনে তুলেন।
"আমি যখন বলেছি যাবো তখন যাবোই। আর চন্দ্রবিলাশ একা একা করা যায় নাকি। আমার বউ আছে না? এতো সুন্দর বউ ছাড়া  চাঁদ দেখতে গেলে তো চাঁদ আমার সাথে রাগ করবে।"
খাদিজা বেগমের কোনো কথাই কানে তুললেন না শোহেব সাহেব। জোর করে নিয়ে এলেন নদীর পাড়ে। নিরিবিলি একটা পরিবেশ, চাঁদের অকৃত্রিম আলো সাথে ওনার প্রিয়তমা। খাদিজা বেগমের প্রথমে বিরক্ত লাগলেও এখন ভালো লাগায় মন প্রাণ ভরে যাচ্ছে।হাতের মুঠো থেকে  বাদামের প্যাকেট বের করে নিজেও খায় শোহেব সাহেবকেও দেয়। দুজনে মিলে নানান গল্পে মত্ত। যেন দুজন সেই ফেলে আসা তরুন শোহেব আর তরুণী খাদিজাতে চলে গেছেন। খাদিজা বেগম মাঝে মধ্যে নিজের ভাগ্য নিয়ে অবাক না হয়ে পারেন না। এমন ভাগ্যও হয় কারো? স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই তার কাছে তার স্বামী পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ। যাকে তিনি বড় ভাগ্য করে পেয়েছেন।

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.