"বউ মা তুমি শাশুড়ি হিসাবে একদম অযোগ্য।"
শাশুড়ি মায়ের কণ্ঠের দৃঢ়তা দেখে আমি মাথা নিচু করে ফেললাম।
দীর্ঘ বত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি আমাকে কয়েক লক্ষবার অযোগ্য হিসাবে ঘোষনা করেছেন। আজ নতুন নয়। আমি প্রতিবারই মাথা নিচু করে ফেলেছি, আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি।
চব্বিশ ঘণ্টা একটা পরিবার, একজন মানুষকে খুশি করার অব্যর্থ চেষ্টা করার পরও দিন শেষ যখন আমার মূল্যায়ন এভাবে হতো, তখন আমি কুঁকড়ে যেতাম, মুচড়ে যেতাম, ভেঙে যেতাম, ব্যর্থ, পরাজিত মানুষের মাতো। আজ আর কুঁকড়ে যাইনি। মাথা নিচু করেও আমি কণ্ঠের দৃঢ়তা ধরে রেখেছি।
তিনি আমাকে কোণঠাসা করে রাখার জন্য ধরনা করে অযোগ্য ঘোষনা করলেও তখন কিন্তু আমি সত্যি সত্যি অযোগ্য হয়ে যেতাম।
চা বানাতে গেলে হাত থেকে পাতিলসহ লিকার পড়ে যেতো। প্লেট ধুতে গেলে হাত থেকে পড়ে ভেঙে যেতো। তরকারি রাঁধতে গেলে লবন দিতাম না।সেমাই রান্না করতে গেলে দুধের গুড়োর জায়গায় হরলিক্সের গুড়ো দিয়ে ফেলতাম। সবই অবচেতন মনে করতাম। ঐ যে আমি ব্যর্থ সেটা শুনতে হয়েছে। সাথে সাথে আমার আত্মবিশ্বাসও কমে গিয়েছে।
কেউ কেউ আছেন যাদের কোনো কাজ খারাপ বললে তারা ভালো করার চেষ্টা করেন। আমি তাদের দলে নই।
আমি একটু ব্যতিক্রম, আমি কষ্ট করে কোনো কাজ করলে কেউ গুণ না খুঁজে দোষ খুঁজে বের করলে আমার কাজটা আরও খারাপ হয়ে যায়। এটা আমি ইচ্ছাকৃতভাবে করি না । নিজে নিজেই হয়ে যায়।
তখন যে আমি সত্যি সত্যি অযোগ্য সেটা আর কেউ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় না। এমনি এমনি প্রমাণীত হয়ে যায়।
এসব অবশ্য আমার দোষ নয়, আমার বয়সের দোষ। কিশোরি বয়সে বিয়ে হলে যা হয় আর কি!
যে বয়সে মেয়েরা কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কলেজে যায়, মার্কেটে যায়, বেড়াতে যায়, ঘুরতে যায় সে বয়সে আমি বউ হয়ে কাঁধে তুলে নিলাম এক বিশাল পরিবারের দায়িত্বের বোঝা।
মাত্র এসএসসি পাশ করেছি, বয়স সতেরো বছর নয় মাস এগারোদিন। কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য পরিকল্পনা করছি।
এমন সময় একদিন বাজার থেকে এসে আব্বা বললেন
আগামী শুক্রবার আমাকে দেখতে আসবে, পছন্দ হলে ঐ দিনই বিয়ে।
আমি অমত করতে পারিনি। যন্তচালিত রোবটের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেলাম। কারণ সমাজে আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারে যত তাড়াতাড়ি মেয়ের বিয়ে দেয়া যায় ততই বাবা মায়ের সম্মান।
আশে পাশে অনেক মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে, আমারও হবে, এটাই স্বাভাবিক।
স্বাভাবিক ভাবেই আমি খুশি মনে সব মেনে নিলাম।
বিপত্তি বাঁধল শ্বশুর বাড়ি এসে। আমি বিশাল একটা যৌথ পরিবারের একমাত্র বউ। আমার ভাসুর, দেবর ননদ, মোট নয়জন আমার স্বামীসহ। সবাই পড়াশোনা করছে, বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। বড় ভাসুর চাকরিও করছেন। আমি মেজো ছেলের বউ।
শুধু আমার স্বামী পড়েন না। উনার পড়তে ভালো লাগে না। টেনেটুনে ক্লাস নাইন অবধি পড়াশোনা করেছেন। এখন পারিবারিক ব্যাবসা দেখেন। বাজারে বড় একটা মুদি দোকান আর একটা হার্ডওয়্যারের দোকান আছে আমার শ্বশুরের, যেটা মূলত আমি স্বামী পরিচালনা করেন।
অথচ উনার বড় ভাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সহিত পাশ করে বড় চাকরি করছেন।
তখনও তিনি বিয়ে করেননি।
হঠাৎ করে একক সিদ্ধান্তে শাশুড়ি মা মেজো ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিলেন।
ঝাঁঝাল কণ্ঠে শাশুড়ি মা আবারও বললেন
" কী হলো চুপ করে আছো কেন? তোমার মতো বুদ্ধিমতি মেয়ের থেকে আমি এটা কোনোভাবেই আশা করিনি।"
" জি মা।"
" জি মা, জি মা! করছ কেন? এখুনি ফোন দাও আকাশকে। বলো আমি অসুস্থ। কালকের মধ্যেই যেন ফিরে আসে।"
" কেন মা? কালকের মধ্যে আসবে কেন? আকাশ হাসপাতাল থেকে ছুটি নিয়েছে। ওরা হানিমুনে গেছে। আপনার অসুখ হলে আমরা আছি, অন্য ডাক্তার আছে। আকাশকেই কেন আসতে হবে।"
" বউ মা তুমি কি ঘাস খেয়ে শাশুড়ি হয়েছ? আমাকে দেখেও শিখতে পারনি? এখনি লাগাম টেনে ধরো। একবার হাত ছাড়া হয়ে গেলে আর পারবে না।"
" মা আমি আপনার থেকে অনেক কিছু শিখেছি, বলতে গেলে সব। দুঃখিত আপনার থেকে এই শিক্ষাটা আমি শিখতে চাইনি। ছেলের বউ কোনো পশু নয় যে লাগাম টেনে ধরতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা আমি এটা চাইও না।"
শাশুড়ি মা হাসলেন, তিরষ্কারের হাসি।
" শুনলাম আকাশকে না-কি বউ নিয়ে তিনতলার ফ্ল্যাটে থাকার জন্যে বলেছ!"
" জি মা। হানিমুন থেকে ফিরলেই ওরা তিনতলায় চলে যাবে। আমি আমেনাকে দিয়ে সব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রেখেছি।"
" কিন্তু কেন? এসব নাটক কেন করছ?"
" কিসের নাটক মা।"
" শোন আমি তিন ছেলের মা। তাদের বউ, ননদ, জা সবাইকে কৌশলে কেমন হাতের মুঠোয় রেখেছি দেখনি? দেখার তো কথা। অবশ্য সবটা না দেখলেও সব শুনেছ। যার কারণে আমার পরিবারে আমি আজও রাজত্ব করে বেড়াচ্ছি। "
" জানি মা। কিছু দেখেছি বাকিটা শুনেছি। আমি রাজত্ব করতে চাই না মা।"
" তুমি আসলেই ভীষণ বোকা এবং অযোগ্য। কিছুদিন পরেই টের পাবে, যখন বউর আঁচলের ভেতর ঢুকে যাবে আদরের ছেলে। একই বাসার উপর নিচে থেকেও ছেলে দিনের পর দিন তোমার কাছে আসবে না। তোমার চেয়ে বউয়ের রান্না ইউনিক বলবে।"
" মা আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আমি পুরোপুরি অযোগ্য। যোগ্য স্ত্রী হতে গিয়ে, যোগ্য পুত্রবধূ হতে গিয়ে, যোগ্য ভাবী হতে গিয়ে আমি অযোগ্য সন্তান হলাম, অযোগ্য বোন হলাম, অযোগ্য মা হলাম।
এবার না হয় অযোগ্য শাশুড়ি হয়ে যোগ্য মানুষ হতে চাই।"
" কী বলতে চাচ্ছ তুমি? কিছু না মা। চা খাবেন? সাথে গরম গরম পাকোড়া? "
শাশুড়ি মা কোনো জবাব না দিয়ে চুপ করে আছেন। তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি সারাটা জীবন তাঁর সাথে "ইয়েস বস" করা মেয়েটা এভাবে কথা বলবে।
আমি সালমা আক্তার। কোনো দিন শাশুড়ির মায়ের মুখের উপর কথা বলিনি। অন্যায় হলেও দুঃখ প্রকাশ করেছি, অন্যায় চাপিয়ে দিলেও করেছি।
দিন শেষে যত কথাই পিছনে বলুক, সামনে আমি এবাড়ির যোগ্য বউ মা।
গতপরশু আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে হয়েছে। আমি নিজেও শাশুড়ি মা হয়েছি।
এখন নিজের ছেলে আর ছেলের বউয়ের ব্যাপারে কি করব না করব সেটা আমার একার সিদ্ধান্ত। আমার সন্তানের জীবনে কোনো প্রভাব খাটাতে আমি তাঁকে দেব না। সে কারণে বিয়ের এতগুলো বছর পর বাধ্য হয়েই মুখে মুখে কথা বলেছি।
তিনি আমার শাশুড়ি, আমার স্বামীর মা। আমি তাঁকে শ্রদ্ধা করি, সম্মান করি, ব্যাস এটুকুই।
আমার ছেলের বিয়ে নিয়ে আলোচনা হওয়ার প্রথম থেকে মা চাচ্ছেন না। ছেলেকে আমি কোনো ডাক্তার মেয়ে বিয়ে করাই।
তাঁর মতে ছেলের বউ হবে গৃহীণি। ঘরে থাকবে, রান্না করবে, শাশুড়ির কথা মতো চলবে। যতবড় শিক্ষিত মেয়েই হোক, সে চাকরি করতে পারবে না। বউ চাকরিজীবী হওয়া মানে অবাধ্যতা করা।
তিনি যেরকম একটা ছেলেকেও চাকরিজীবী মেয়ে বিয়ে করাননি।
আমি কম পড়ুয়া, আমার চাকরি করার যোগ্যতা নেই। অথচ পড়াশোনা জানা বড় ভাবী, ছোট বউকেও তিনি চাকরি করতে দেননি।
অহনা আমার ছেলের বউ। মেডিকেলে চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। আমি চাই আমার ছেলের মতো সেও এফসিপিএস করবে , বিসিএস করবে। স্বামী -স্ত্রী সমযোগ্যতার না হলে সংসারে শান্তি থাকে না।
শুধু যৌনতার জন্য স্ত্রী নয়, সন্তান জন্মদেয়ার জন্য বিয়ে নয়, রান্না করার জন্য বউ নয়, অার্থিক চাহিদা মেটানোর জন্য স্বামী নয়।
তারা পরষ্পরের বন্ধ হবে। মন খুলে কথা বলবে, গল্প করবে, আড্ডা দেবে। দেশের সাংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি কোনো কিছুই যেন তাদের গল্পের বিষয়বস্তু থেকে বাদ পড়ে না যায়।
বউ খেলা বুঝে না বলে যেন আমার ছেলেকে খেলা দেখার জন্য অন্য মানুষকে সঙ্গী করতে না হয়।
আমি বত্রিশ বছর সংসার করেছি। সংসার বলতে কি! রান্না করেছি আর হুকুম পালন করেছি। আমি কত সৌভাগ্যবতী আমাকে নিজের হাতে একটা চা চামুচও কিনতে হয়নি। সব পৈত্রিক সূত্রে শাশুড়ি মায়ের থেকে পেয়েছি।
সবাই আমাকে কত সৌভাগ্যবতী মনে করে। অথচ সৌভাগ্য কী তারা আসলে বুঝেই না। বিয়ের পর একটা মেয়ে নিজের হাতে নিজের সংসার সাজাবে। হাঁড়ি-পাতিল কিনবে, ফার্নিচার বানাবে, গাছ লাগাবে, আরও কত কি!
বত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে আমাকে কিছুই করতে হয়নি। আমি যে খাটটায় শুই, সেটাও পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া। আমার স্বামী বাবা-মায়ের স্মৃতি রক্ষা করবেন।
আমিও মেরুদন্ডহীন বউ- স্ত্রী, স্বামী -শাশুড়ির সব আবদার, আদেশ, অনুরোধ মেনে নিয়েছি।
ঐ যে সৌভাগ্যবতী বউ হিসাবে বাবার বাড়ি, শ্বশুর বাড়িতে খেতাব পেয়েছি।
সেকারণে ভেতরের অপ্রাপ্তির অশান্তি, নিজের কিছু না হওয়ার যন্ত্রণা কাউকে দেখাইনি।
চারদিন পর ছেলে বউ নিয়ে ফিরে এলো হানিমুন থেকে। আমি তিনতলার দক্ষিণ পাশের চার রুমের বড় ফ্ল্যাটটা ছেলের বউ আর ছেলের জন্য ঠিক করে রেখেছি ওর বাবার সাথে আলোচনা করে।
ওদের ঘরের জন্য আমি একটা খাট, একটা ড্রেসিংটেবিল আর একটা ওয়্যারড্রব ছাড়া আর কিছুই কিনিনি।
ছেলে আমার ডাক্তার, তার নিজের রোজগার আছে। সে নিজের পছন্দে স্ত্রীকে নিয়ে নিজের ঘরের জিনিসপত্র কিনবে। অহনা ঘর সাজানোর আনন্দে আনন্দিত হবে।
আকাশ ছেলে মানুষ সে ঘর সাজানোর আনন্দ বুঝবে না।
স্ত্রীর আনন্দ দেখে সে খুশি হবে। আমরা বাবা -মা তো দিন শেষে সন্তানের সুখই দেখতে চাই।
শাশুড়ি মা আমাকে বোকা ভেবে খুব আপসোস করছেন। তাঁর ধারনা আমি ছেলের বউকে নিজের কাছে না রেখে ছেলেসহ আলাদা বাসায় দিয়েছি। তারা আমাকে আর মূল্যায়ন করবে না, আমার কথা শুনবে না। নিজেরা আনন্দ ফূর্তি করবে।
আমি এটা করেছি আমার শাশুড়ি মায়ের ধারনাকে মিথ্যা প্রমাণীত করার জন্য।
তিনি তিন ছেলের বউকে হাতের মুঠোয় রেখেছেন, সবাই তাঁর কথা মতো চলেছে।
আমরা কখনো তাঁর অবাধ্যতা করিনি। দিন শেষে তিনি সুখি, আমরা সুখি কি-না তিনি কি কখনো সেটা ভেবে দেখেছেন?
মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন থাকতে পছন্দ করে, পাখির মতো উড়ে বেড়াতে তার ইচ্ছে করে। সোনার খাঁচায় বন্দী থাকতে পাখির মতো কোনো মানুষও পছন্দ করে না।
তিনি বন্দী করে রেখেছেন নিয়মের বেড়াজালে সব বউদের। তারা মুক্তির পথ খুঁজে। লুকিয়ে দীর্ষশ্বাস ফেলে।
আমি শাশুড়িকে দেখাতে চাই বন্দী করে না রেখেও ছেলে আর ছেলের বউয়ের ভালোবাসা পাওয়া যায়।
বিয়ের তিনমাস পর একদিন অহনা বাটিতে করে খিঁচুড়ি রান্না করে নিয়ে এলো আমার কাছে।
"আম্মু তোমার হাতের গরুর মাংস রান্না অপূর্ব। আমি খিঁচুড়ি রান্না করে এনেছি, তুমি মাংস রান্না করবে। আমি পিঁয়াজ, মরিচ সব কেটে দিয়ে তোমাকে রান্নাঘরে সাহায্য করব। তুমি আমাকে মাংস রান্না শিখাবে।"
শুধু আজ নয়। তিনতলায় থাকলেও কলেজের সময় আর পড়াশোনার সময় ছাড়া অহনা বেশিরভাগ সময় আমার কাছেই থাকে। আমরা বিকালে একসাথে ছাদে আড্ডা দেই। একসাথে শপিং করতে যাই।
আকাশ প্রতিদিন একসাথে আমার এখানে নাস্তা করে।
ডাক্তার মানুষ ছুটি পায় না। তারপরও সুযোগ পেলে শ্বশুর বাড়ি থেকে ঘুরে আসে।
অহনাও এক বাবার এক মেয়ে। বেয়াই রিটায়ার্ড করেছেন। তারা স্বামী-স্ত্রী দুজন ছাড়া বাসায় কেউ নেই।
আমি তাদের অনুরোধ করেছি মেয়ের কাছে এসে থাকার জন্য।
বেয়ান আমাকে আশ্বস্ত করেছেন তিনি মাঝেমধ্যে চলে আসবেন।
আমার শাশুড়ি মা এসব বসে বসে সব দেখছেন। ঐ দিনের পর থেকে তিনি আর কোনো মন্তব্য করেননি। ভেবেছি হয়তো আমার বাড়াবাড়ি দেখে বিরক্ত হচ্ছেন।
একদিন বিকালে আমি আর অহনা বসে গল্প করছি। শাশুড়ি মা আমাদের কাছে এলেন।
কী মনে করে আমাকে আর অহনাকে বুকে টেনে কপালে চুমু খেলেন।
আমি তাঁর ঘোলানো ঝাঁপসা ছোখের দিকে তাকালাম, যেখানে কেবল অনুশোচনা।