ছোটগল্প - বাবা

Anonymous
দরজার বাইরে থেকে আম্মার খুকখুক কাশির আওয়াজ পাইলাম । রাত প্রায় একটা বাজে । এত রাতে কাশি মানে দুইটা সিগনাল । সিগারেট জ্বালানো থাকলে নেভাও, আর আলাপটার গুরুত্ব বোঝ ।

- আম্মা আস, এত রাতে কাশি শুনলে ভয় লাগে।

- তুই এখনও সজাগ আছোছ?

আম্মার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। আম্মাও হাসলেন ।  তবে হাসিটা একটু মলিন। বুঝলাম আমার জন্য আবারো মনে হয় কাউকে পছন্দ হয়েছে আম্মার।

আমি আর আম্মা একা থাকি। সাথে আমার এক ফুফু। ওনার দুই ছেলে দুই মেয়ে থাকা সত্বেও বলেন ওনার তিন কূলে কেউ নাই। ছেলে মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। ফুফুর আর্থিক অবস্থা ভালো। আব্বা ওনারে পছন্দ করতেন। উনি সেইটা মনে রাখছেন। দেশে জনগনের অভাব নাই, অথচ প্রকৃতির কী অদ্ভুত খেয়াল!  আমরা তিন জগতের তিন মানুষ ঝাড়া হাত পা ।

আম্মা বিছানায় বসলেন। ওনারে একটু টায়ার্ড লাগতেছে দেখে আমার মন খারাপ হয়। বুঝতে না দিয়ে বলি, "কী হইছে আম্মা? আমার জন্য আর কাউকে মনে ধরছে?"

- "নারে, তোর ঢাকার খালুর অবস্থা খুব খারাপ, তুই যদি একটু দেখে আসতি।"

আমার চার খালু। বাড়ির খালু, ঢাকার খালু, লন্ডনের আর আমেরিকার খালু। আশ্চর্য ব্যাপার বিদেশের দুইজন মারা গেছেন আগে। বাড়ির উনি এখনও তরতাজা। ঢাকার উনার যাই যাই অবস্থা ।  

আমি একটু অস্বস্তি নিয়ে আম্মারে দেখি। আম্মা মাথা নিচু করেন। একটা বয়স এলে পরে মানুষ বোধহয় কম্প্রোমাইজ করে। আমার এই ঢাকার খালার সাথে আমাদের যোগাযোগ নাই অনেকদিন। 

ঢাকার ওয়ারীর র‍্যাংকিন স্ট্রীটের বিশাল বাড়িটার সামনে যখন নামলাম, একটু অবাক হইছি। প্রায় তিন বিঘা জায়গার উপর এই বাড়িটার একটা আভিজাত্য ছিল। এখন দেখি আভিজাত্য মরে  লম্বা লম্বা বিল্ডিং হয়েছে। পয়সাওয়ালা মানুষদের বিরাট সমস্যা, তাঁরা  সারাজীবন পয়সার পেছনে ছুটতে ছুটতে সেই পয়সার প্রকৃত স্বাদ কখনো পান না।
 
বাচ্চা  গেইটে ধাক্কা দিলাম। ভেতর থেকে মিলিটারি আওয়াজ এলো, "কে?"

অবাক ব্যাপার! খালুর পুরানা কেয়ারটেকার কাবুল মিয়ার গলা এইটা। কাবুল মিয়া আমাকে দেখে জড়িয়ে  ধরল। আমার খারাপ লাগে না। বুড়া হয়ে  গেছে কাবুল মিয়া। চোখে একটু পানি। 

মানুষের মায়া বড় বিচিত্র ধারায় চলে। নিজের খালার বাড়িতে আমি অনাহূত অথচ কেয়ারটেকার কান্দে। সময় এখন খুব খারাপ। 

ভাবছিলাম বাড়ি ভর্তি মানুষজন হবে। সেইরকম কিছু না। আমি তৃপ্তি সহকারে মাছ মাংস দিয়ে খাচ্ছি আর খালা আমার সামনে বসে কানতেছেন। খালুর জন্য না, আমি যে আসছি এইটা নাকি ওনার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। 

দেশি মুরগির রানের জয়েন্টে কামড় দিতে দিতে বললাম, "তুমি যেইভাবে কানতেছো খালা, পুরা স্টক তো শেষ হইয়া যাইব।"

খালা এইবার শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। মার্বেল পাথরে কারো দ্রুত অথচ লঘু পায়ের শব্দ শুনে আমার ভেতর বহু পুরোনা একটা বেহালার সুর বেজে উঠল।  মীরার পায়ের আওয়াজ আমার চেনা আছে।

নাটকে যেমন দেখায়  বাস্তবে সেইরকম কিছু ঘটল না। মীরা খালাকে ধরে জিজ্ঞাসা করল, "আম্মা কী হয়েছে?"

উত্তরটা আমিই দিলাম, "কিছু হয় নাই মীরা, আমাদের মিলন পর্ব খালা সেলিব্রেট করতেছেন।"

মেয়েরা অভিনয় ভালো পারে। মীরা পলকে বিস্ময় লুকিয়ে বলল, "তুমি কখন আসছো?"

- "সকালে আসছি। তুই কি ফরমালিন মাখোছ নাকি?  বারো তেরো বছর আগে যেই রকম দেখছিলাম তেমনই আছোছ।"

- "তোমার স্বভাব দেখি বদলায়নি নীল ভাই?"

প্লেটে দই নিলাম। ইচ্ছা করে বেশি নিছি। মীরা ভ্রু কুচকে তাকালেও কিছু বলল না।

সন্ধ্যার সময় খালুর রুমে গেলাম। এলাহি কারবার। রুমটা ঝকঝকে পরিষ্কার। ভাবছিলাম ডেটল ফেটলের ঘ্রাণ পাবো। তার বদলে জেসমিন এয়ার ফ্রেশনার। পুরানা দিনের ভারতীয় বাংলা ফিল্মের নার্সের মতো  একেবারে কড়া ইস্তিরি করা ইউনিফর্ম পরা নার্সের মাথায় টেলিভিশনে দেখা শেফের টুপী। খালুর হুশ জ্ঞান বোধহয় কম, তবু আমায় চিনতে পেরেছেন।

রাতের বেলা এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। খালু আমাদের সাথে খেতে বসলেন এবং ভালো মতোই খাওয়াদাওয়া করলেন। খালুকে বললাম, "এরা আপনারে পুরা আইসিইউ-তে রাখছে খালু। আপনি এখন থেকে রাত দশটার পর কোনো অষুধ খাবেন না, দুইটা ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে বিছানায় যাবেন  আর ফজরের সময় উঠবেন।"

খালু হাসলেন। সেই হাসিতে তেজ না থাকলেও অন্যরকম দ্যুতি আছে। মানুষ মারা যাবার সময় এইটা ঘটে।

ছাদে বসে বসে সিগারেট টানছি। মীরা এসে পাশে বসলো। বড়লোকের ছাদে বসার সিস্টেমটাও আরামের।

- "কিছু বলবি?"
- "তুমি বিয়ে করলে না কেন?"
- "ধুর, এইসব রাখ।"
- "তুমি কি এখনো মেয়েদের হাত দেখ?"

প্রবল জোছনার মাঝে মীরার দিকে তাকিয়ে আমার মায়া হলো। এই মেয়েটা ভুল করে একদিন বলছিল আমাকে ভালোবাসে। আমি তখন খালার বাসায় থেকে ঢাকা কলেজে অনার্স পড়ছি। খালুর কানে যাবার পর আমার এই বাসা পর্ব শেষ হওয়ার পাশাপাশি দুইটা পরিবার আলাদা হয়ে গেল।

একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম, "মেয়েরে নিয়া চিন্তা করিছ না, তোর হাজব্যান্ড তাকে নিতে পারবে না। কানাডায় জোরাজুরি চলে না।"

মীরা যেন ৩৩ হাজার ভোল্টের ইলেকট্রিক শক খেয়েছে। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলল, "আমার সেপারেশনের খবর কেউ জানেনা, তুমি কীভাবে জানলে?"

মীরার দিকে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালাম। দিনের আলো কিংবা জোছনায়,  কোনো মেয়ের দিকে এভাবে তাকাইনি কখনো । 

মীরার চোখে দুঃখ কষ্ট কিংবা কোনো বিভ্রান্তি নেই। সেই চোখে এক অদ্ভুত নিস্পৃহতার সাথে সামান্য একটু কৌতুহল, শেষ বিকেলের গাঢ় কমলা রংয়ের অস্তগামী সূর্যের মতো ঝুলে আছে।

আমি মীরাকে অনুভব করতে পারছি। আপাত কঠিন এই মেয়েটার ভেতর কী অদ্ভুত কোমল একজন মানুষ নিঃশব্দে বাস করে। খালা খালু সবসময় তাঁদের একমাত্র মেয়ের বাইরের খোঁজখবর নিয়েছেন। মীরার সমস্ত অভাব পূরণ করেছেন। কিন্তু কোনোদিনও তাঁদের মেয়ের ভেতরটা তাঁরা স্পর্শ করতে পারেননি। সেই সুযোগও ছিল না।   

আমি মীরার বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে মৃদু একটা চাপ দিয়ে সরিয়ে নিলাম। 

আমার আবেগ শোভা পায় না। নাগরিক জোছনা তখন চারপাশে এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মাখন গলা জোছনা আমার কপাল চোখ বেয়ে নেমে আসে। 

একটা দীর্ঘশ্বাস চেপে বলি, "মীরা, আমি কোনোদিন অন্যকোনো মেয়ের হাত দেখি নাই, তোদের এইখানে থাকার সময়  কিরোর বই পড়ে তোর উপর প্র‍্যাকটিস করছি।"

মীরা চুপচাপ বসে থাকে।  আমার একটা ভয়াবহ অসুখ আছে। মীরাকে  বলতে পারি না। আমার বয়স যখন ১১/১২, এক ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে গ্রামের হাঁট থেকে আম্মার জন্য অষুধ নিয়া ফিরতেছিলাম। হঠাৎ দেখি আমি বাড়ির পথ খুঁজে পাইতেছিনা। আমি কান্তে কান্তে আল্লাহরে আর আব্বারে ডাকতেছি। 

হটাৎ কোথা থেকে আব্বা এসে আমার হাত ধরে বাড়ি নিয়া গেলেন। শীতের রাতে আব্বার হাতটা ছিল গরম। হাঁটতে হাঁটতে আব্বা বললেন, "কখনো  ভয় পাইছ না বেটা।"

অথচ আব্বা মারা গেছেন তারও ছয় মাস আগে। 
এরপর থেকে আমি মাঝে মাঝে মানুষের মনের কথা টের পাওয়া শুরু করি। প্রথম প্রথম আতংকিত থাকতাম। অনেক পরে এইটা নিয়া পড়ালেখা করে জানলাম এটা একটা সাইকোলজিক্যাল ডিজঅর্ডার। 

এটাকে থট রিডিং বলে। মিলিয়নে একজন থট রিডার থাকতে পারে। আব্বার বিষয়টা হচ্ছে হ্যালুসিনেশন।  আতংকের কারণে সেদিন এটা ঘটছিল। 

আম্মা, ছোট খালা, মানে বাড়ির খালা খালু আসায় মীরাদের বাড়ি অনেকদিন পর বেশ জমজমাট লাগছে। বহু বছর আগে এই বাড়িতে আমরা খালাতো ভাইবোনরা যখন একত্রিত হতাম, খালু একদিন নিজে রান্না করতেন। আব্বা আমাদের নিয়ে আসতেন। তখন মানুষদের মনে অন্যরকম আনন্দ ছিল। আব্বা বলতেন, "গরুর মায়া জিভের ছোঁয়ায়, মানুষের মায়া আসা যাওয়ায়।"

এই বাড়ির পেছন দিকে অসংখ্য গাছগাছালি ভরা বিশাল একটা বাগানের মাঝখানে শান বাঁধানো ছোটখাটো একটা দীঘির মতো পুকুর  ছিল। 

পুরোনো ঢাকার ওয়ারীর র‍্যাংকিন ষ্ট্রীট সবসময়ই অভিজাত। এমন বাড়ি আশপাশে আরো কয়েকটা রয়েছে। মীরাদের পুকুরটা এখনো রয়েছে, কিন্তু  আশপাশ জংলা মতো অবস্থা।

আম্মা খালারা মহা ধুমধামে খাইতেছেন আর কানতেছেন। খালুর চোখে আনন্দের ঝিলিক। মীরা বিস্মিত হয়। কারণ সে  সারাজীবন খালুকে শুধু টাকা রোজগার করতে দেখছে।  

একটা সময় এই মানুষটা আলোর কাছাকাছি থেকে অন্ধকারে চলে গিয়েছিলেন, এখন ফিরে আসতে চাচ্ছেন।

এইটা সহজ না। আল্লাহতালা মানুষের ভেতর আলো আঁধার দুইটাই দিছেন। অন্ধকার  নিয়া বেশিদিন থাকলে সমস্যা হয়।

আমার সাথে খালু প্রতিদিন ছোট ছোট বিষয় নিয়া আলাপ করেন। আমি টের পাই এইটা একটা ওয়ার্ম আপ। অবশেষে খালু আসল কথায় আসেন।
- "তোমারে দুইটা অনুরোধ করি নিলয়।"
- "খালু, আপনি মুরব্বী মানুষ, অনুরোধ করা লাগবে না। আপনার একটা কথা আমি রাখব এইটা আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।"

খালু হা করে আমার দিকে  তাকালেন।  উনি জানেন আমি এই বিষয়টা গোপন রাখছি। 

খালুর রুম থেকে বেরিয়ে আসার আগে অসহায় মানুষটা আমার হাত ধরে ক্ষমা  চেয়েছেন। আমি কখনো মানুষের প্রতি ঘৃণা বিদ্বেষ রাগ পোষণ করে রাখিনি।  খালুর হাত ধরে খুব সুন্দর একটা হাসি দিয়েছি। 

আমার এই হাসিটা নাকি অন্যরকম। সংক্রামক  হাসি।  আমি জানি না, অনেকে বলে। হইলে হইতেও পারে। 

পৃথিবীতে রোগ আর কান্নাই কেবল সংক্রামক নয়, নিষ্পাপ হাসি খুব কঠিন মানুষকেও ছুঁয়ে যায়।

অবশেষে আমি পঁচিশ ছাব্বিশ বছর পুরোনো একটা পরিবারের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। মানুষ এক জায়গায় বেশিদিন থাকলে তার আশেপাশেই থাকতে পছন্দ করে। তবে উনি সেই নিয়মের বাইরে চলে আসছেন।

রজনী চৌধুরী লেনের টিন শেডের বাসা থেকে যখন বাইরে আসলাম, মনটা ভালো হয়ে গেছে। ঢাকায় অনেকদিন থাকতে থাকতে আমি ক্লান্ত। এইবার যাওয়ার সময় হয়েছে।

দু'দিন পর দুপুরে উকিল, ব্যাংকের ম্যানেজার, ল্যান্ড রেজিস্ট্রি অফিসের লোকজনের সামনে খালু ওনার  বাড়ির কম্পাউন্ডের ভেতরের দুইটা ব্লক এপার্টমেন্টের একটা পুরো ব্লক, আর নগদ দুই কোটি টাকা ওনার প্রাক্তন  ব্যবসায়ীক পার্টনারের স্ত্রীকে লিখে দিলেন। ষোলোটা ফ্লাট আছে এইখানে।

খালু পঁচিশ ছাব্বিশ বছর আগে এই পুরো বাড়ি নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছিলেন। কথা ছিল পঞ্চাশ  লক্ষ টাকা কিস্তিতে শোধ করবেন। মাত্র দুই লক্ষ টাকা দেওয়ার পর জ্যোতি মোহন চৌধুরী মারা যান। ওনার স্ত্রী তিন মেয়ে আর এক ছেলে নিয়ে রজনী চৌধুরী লেনে কোনোরকম টিকে আছেন। এক মেয়ে বিধবা। 

আমি খালার বাসায় থাকতে একদিন খালু ভদ্রমহিলাকে চাবুক দিয়ে পিটিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। বাসায় তখন কেউ ছিলনা। আমি খালুর হাত ধরে থামিয়েছি। এইটা খালুর পছন্দ হয়নি। আমাদের আত্মীয়স্বজন সবাই গুজব শুনলো মীরার সাথে সম্পর্ক থাকার অপরাধে খালু আমাকে ওনার বাড়ি থেকে বের করে দিছিলেন।

আমি অনেক হাঁটছি আমার এই ছোট্ট জীবনে। অনেক মায়ার বাঁধন কাটছি। একটা ক্ষতের দাগ ছিল, এখন সেইটাও নাই। আমার মতো মানুষদের এইরকম  দাগ থাকলে সমস্যা। আমি হইছি ব্যথাশূন্য মানুষ। 

মীরার ধারণা খালুর দান খয়রাতের পেছনে আমার হাত আছে। অথচ তার জানা নাই তার দুই ভাই খালি রাস্তায় পাগলের মতো স্পিডিং করে কেন মারা যাবে?  

অভিশাপের কোন ধর্ম নাই। নিয়তি অবধারিত ভাগ্যের কাছেই মানুষকে হার মানতে হয়। এর ব্যত্যয় হয়নি কখনো। 

খালু  ধীরেধীরে সুস্থ হইতেছেন। মীরারও যাওয়ার সময় হয়েছে। আমি দুই একদিনের ভেতর চলে যাবো। আম্মা  খালা খালু চলে গেছেন। বাড়িটা ফাঁকাফাঁকা লাগে। আমি মাঝেমাঝে যেন রবীন আর সুমনের অস্তিত্ব টের পাই। পিঠাপিঠি দুই ভাই আমাকে খুব পছন্দ করত। আমার কলেজ বন্ধ থাকলে এরা আমারে সিলেট যাইতে দিতে চাইতো না।

মীরাদের বাড়ির পেছনের জংলা মত জায়গায় দোলনাটা আগের মতোই আছে। আমি বসার  সময় এটা ক্যাঁচ ক্যাঁচ, কিঁচ কিঁচ শব্দে প্রতিবাদ করে। আকাশে পরিপূর্ণ চাঁদ। 

শহরের জ্যোৎস্না আর মফস্বলের জোৎস্নার মাঝে তফাৎ আছে। তবে এইখানে গাছ গাছালি থাকায় হালকা শিশিরের মাঝে আমি চন্দ্রস্নানে ভিজতে থাকি। আমার ভয় লাগেনা, মনে হয় যেন আব্বা পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন। 

আব্বা খুব সাহসী মানুষ ছিলেন।  সাংবাদিক হওয়ার অপরাধে আমার সামনে আব্বাকে কুপিয়ে আর গুলি করে কারা যেন মেরে ফেলল।

তখন দুপুর।  প্রবল বৃষ্টির মাঝে আমি আর আব্বা এক ছাতার নিচে ছিলাম। তারা ছয় সাতজন যখন সামনে এসে দাঁড়ালো, আব্বা কীভাবে যেন টের পেয়ে সহসা আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলেন। সময় থমকে গেল। 

আমি রাস্তার মাঝে বৃষ্টি কাদায় আব্বাকে জড়িয়ে ধরে থরথর করে কাঁপছি। আমাদের অভাবের সংসারেও বড় আনন্দ ছিল। আমি আব্বার সাথে ফুটবল ব্যাডমিন্টন খেলতাম। আমার পৃথিবীটা ছিল কেবলই বাবাময়। আমি টের পাচ্ছি আব্বা মারা যাচ্ছেন। অসময়ে আমার বড়বোনকে মরতে দেখে আমি সেই বয়সেই মৃত্যুকে চিনতে পেরেছি। আব্বা আমার কাঁপুনি টের পেয়ে হাসিমুখে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, "ভয় পাইছনা বেটা, আব্বু সবসময় তোর সংগে থাকব।"

আব্বার চোখের কোণে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা কেন যেন আটকে গেছে। আচ্ছা চোখের জলের ঘনত্ব কি বেশি?  আমার জানা নেই।

স্রষ্টা বড় করুণাময়। আমার মস্তিস্কে আব্বার স্মৃতিটা পরম মমতায় লালিত করেছেন। আমি সিজোফ্রেনিক না। আব্বার শেষ কয়েকটি কথায় আমার ভেতর কনফিডেন্স সৃষ্টি হয়েছে। এগারো বারো বছরের একটা বাচ্চার জন্য যা করা দরকার, আব্বা অন্তিম সময়েও সেটা করার চেষ্টা করেছেন।

চাঁদের আলোয় দোলনাটা এমনিতেই দুলতে থাকে। আমি ভয় পাইনা। কেন যেন মনে হয় আব্বা দূর থেকে আমায় দেখছেন।

মনের অজান্তেই আমি চোখ বন্ধ করলে, কোমল বাতাস আমার মাথের পেছনটা  ছুঁয়ে দিয়ে যায়। সেই ছোঁয়ায় আমার ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে। 

আমি বরং সেই বিভ্রান্তি উপেক্ষা করে, স্নেহ মেশানো প্রবল জ্যোৎস্না ধারায় আমার দু'চোখ রাখি।

Post a Comment

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.