
আমার শ্বশুর আর জামাই বিরাট মাপের কিপ্টা। তাদের টাকা-পয়সার কোনও অভাব নেই, তবুও কিপ্টামি ছাড়েনা। বিয়ের পর পরই শ্বাশুড়ি আমাকে তার ছেলে ও স্বামী সম্পর্কে আমাকে সব জানিয়েছিল। আর বলেছিল তার ছেলে আমার সাথে কিপ্টামি করতে চাইলেই যেন ধমকিয়ে ঠিক করি। কারন তার ছেলে একটু ভীতু টাইপের। আমিও সেইমতন কাজ করি। বিয়ের আগে থেকেই মাঝেমধ্যে বাজার করত। কিন্তু এমনসব জিনিসপত্র কিনত যে সেগুলো খাওয়ার উপযোগী থাকতনা। টাকা বাঁচাতে কিনত পঁচা জিনিস। অনেক চিল্লাপাল্লা করে শ্বাশুড়িমা তার ছেলের এই বদঅভ্যেস দূর করেছিল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল যেদিন গরুর-খাসির মাংসের দাম বেড়েছে সেদিন থেকে। একদিন সে বাজারে যেয়ে মাংস কেনার সময় শুনছে গরুর মাংসের দাম ৬০০ টাকা কেজি তখন সেখানেই নগদে অজ্ঞান হয়ে ঠাস করে পরে গেছে। লোকজন মাথায় পানি দিয়ে , জ্ঞান ফিরিয়ে বাড়িতে পোঁছে দিয়ে গেছে। তারপর থেকেই শ্বাশুড়ি নিজে বাজারের দ্বায়িত্ব নিয়েছে। কারন শ্বশুর বাবা তার ছেলেরও এককাঠি উপরে। তারপর আমার বিয়ে হল এই কিপ্টা ব্যাডার সাথে। বিয়ের পরদিন থেকেই কিপ্টা ব্যাডা আমার জীবন ত্যানাত্যানা করে দিছে। ভাগ্যিস সেদিন শ্বাশুড়িমা তার ছেলেকে সোজা করার উপায় বাতলে দিয়েছিল।
ছুটির দিন বিধায় আজ জামাই বাড়িতে আছে। সকালের নাস্তা শ্বাশুড়ি-বউ মিলেই বানালাম। সবাই একসাথে নাস্তা করছি। এমন সময় আমার ফোনের রিংটোন বেজে উঠলে আমি ফোন ধরে কথা বলতে থাকি। আমার কথা শুনেই সবাই বুঝেছে আব্বু ফোন করেছে। ফোন রেখে আবার খাওয়াতে মনযোগ দিলাম। শ্বাশুড়িমা জানতে চাইল ও বাড়ির কেমন আছে। আমি বললাম ভালো আছে। সাথে এও বললাম, আব্বু আজ আমাকে দেখতে আসবে। শুনে শ্বাশুড়িমা খুব খুশি হলেন। কিন্তু দেখলাম জামাই আর শ্বশুরের মুখ কালো হয়ে গেছে! সাথে সাথেই বুঝে গেলাম আব্বু আসবে তাই এক্সট্রা খরচ হবে এ ভেবেই এদের মুখ অমাবস্যার চাঁদের মত আমসে হয়েছে। আমি পাত্তা না দিয়ে শ্বাশুড়িমাকে বললাম, সপ্তাহের বাজার শেষ। কাঁচা তরকারি , ডিম , কাঁচা মরিচ কিনতে হবে। আমার কথা শুনেই জামাই চমকে উঠে বলে, " কান্তা কি বলছো এসব! ডিমের দাম কত জানো? আজকাল খবর দেখোনা তুমি? ডিম নিয়ে কত চুলোচুলি হচ্ছে বিভিন্ন চ্যানেলে তা কি জানোনা! এত অপচয় করা ভালো নয়। "
জামাইয়ের কথা শুনেই শরীরে চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক লাগলো। সাথে এও বুঝলাম আব্বু আসার কথা শুনে ও ধরে নিয়েছে ডিম আব্বুর জন্য কিনব ! ভাবা যায় ! কি লেবেলের কিপ্টা হলে মানুষ এমন ভাবতে পারে! দাঁত কিড়মিড় করে চোখ পাকিয়ে বলদাটার দিকে তাকালাম। আমার মুখভঙ্গি দেখেই সে ভিজে বেড়াল ন্যায় মাথা নিচু করে খেতে লাগল। কিন্তু আছে আরেকজন ছেলের ওস্তাদ বাপ, যে কিনা ছেলের পিছনে কাঠি নেড়ে চেতিয়ে দিতে মাষ্টার। তিনি বলে উঠলেন, " বউমা অযথা ডিম কিনে টাকা খরচ করার দরকার নাই। তাছাড়া ডিম ব্লাড প্রেশার বাড়ায়, শরীরের জন্য এতটাও উপকারী নয়। "
তার কথা শুনে আমি না পারছি হাসতে, না পারছি কাঁদতে। হাসি-কান্নার মাঝামাঝিতে অবস্থান করছি বর্তমানে।
শ্বাশুড়ির ধমকে শ্বশুর ক্ষান্ত দিল।
আব্বু এলেন বিকেলে। খাওয়া-দাওয়ার কোন বালাই নেই। শুধু নাস্তা দিলাম। আর দেখলাম তারা দুই বাবা-ছেলেতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।কারণ তাদের খাবার খরচ বেঁচে গেল। আমি এদের কাজ-কারবার দেখে মুচকি হাসলাম। সন্ধ্যার পরেই আব্বু ফিরে গেলেন।
পরদিন সকালে শ্বশুর ঘুম থেকে উঠলে আমি তাকে শুধুই এক কাপ চা দিলাম। শুধু চা দেখে তিনি বললেন, " বউমা শুধু চা দিয়েছ কেন? যাও সেদ্ধ ডিম নিয়ে আসো। তুমি তো জানোই একটা সিদ্ধ ডিম খেয়ে তারপর চা খাই। "
" তা তো জানিই বাবা। কিন্তু ডিমের যে দাম, এত টাকা দিয়ে ডিম খেলে সংসার রাসাতলে যাবে বাবা। আর তাছাড়া ডিমে তেমন কোন গুণ নেই। এই যে দেখুন প্রতিদিন সকালে আপনি একটা করে ডিম খান, এতে করে আপনার প্রেশার বেড়ে গেল আপনি মাথা ঘুরে চিৎপটাং হয়ে মেঝেতে ধরাশায়ী হলেন, আপনার স্ট্রোক হলো, হাত-পা অবশ হল, মুখ বাঁকা হয়ে গেল তখন কি হবে বাবা! তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আপনাকে আর ডিম দিবনা। "
আমার কথা শুনে শ্বাশুড়িমা মুখ টিপে হাসছে। আর শ্বশুর বুকে হাত দিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে পরল। আজ আর নয়। একদিনে এর বেশি ডোজ দেয়া যাবেনা।
জামাই অফিসে যাবে। অফিস যাওয়ার আগে সে একটা ডিমের অমলেট আর দুইটা রুটি সবজি দিয়ে খায়। আজ শুধু দুইটা রুটি আর সবজি দিয়েছি। সে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, " কান্তা অমলেট কই? তুমি জানোনা অফিসে যাওয়ার আগে ডিম না খেলে আমার চলেনা? "
" ডিমের দাম সম্পর্কে তোমার ধারনা আছে চান্দু ? কাল বাজারে যেয়ে যেই শুনলাম ডিমের হালি পঞ্চাশের উপরে তাই আর কিনিনি। এখন থেকে সবজি - রুটি খেয়েই অফিস যাবে। বেশি কথা বললে একটা একটা করে দাঁত উপড়ে ফেলব। " চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললাম।
সেও দেখলাম ভয় পেয়েছে।
এভাবেই ডিম ছাড়া কয়েকদিন কেটে গেল। দুই বাপ-ব্যাটায় ডিম খেতে না পেরে ছটফট করছে কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলছেনা।
রাতে শুয়ে শুয়ে ফোন দেখছি, তখন কিপ্টা ব্যাটা শুতে আসল। আমি চুপচাপ ফোন টিপছি। সে উসখুস করছে কথা বলার জন্য।
" পেটে কি গুঁড়া কৃমি সুড়সুড়ি দেয়, এমন মোচড়াচ্ছো কেন? " আমার কথা শুনেই সোজা হয়ে বসল কিপ্টা ব্যাডা। মিনমিনিয়ে বলল, " বউ ও বউ তুমি এত পাষাণ হয়োনা। তুমি আমার কত্ত ভালো বউ। "
" ঐ কিপ্টার বংশধর কি কইবি সোজা কইয়ালা এত ডং আমার পছন্দ না। "
সে বুঝে গেছে আমার রাগ থার্মোমিটারের সর্বোচ্চ দাগে পৌঁছিয়েছে। তাই আর কিছু না বলে চুপচাপ শুয়ে গেল।
কয়দিন থেকেই শ্বশুর ডিম ডিম করে মাথা খেয়ে নিচ্ছে। তার বিনিময়ে নিজের বউয়ের ধামকিও কম খাচ্ছেনা। এদিকে আমিও বোবাকালা হয়ে যাই তিনি যখন আমার সামনে আসেন। তাই আমাকে বলেও কিছুই লাভ হচ্ছেনা। এদিকে তার ব্লাড প্রেশার আরো কমেছে। প্রতিদিন একটা করে ডিম সে প্রেশার ঠিক রাখার জন্য খায়।
বাবার প্রেশার কমেছে শুনে গুণধর ছেলে আর ঠিক থাকতে পারলনা। সাহস করে আমাকে বলেই ফেলল, " কান্তা আব্বাকে প্রতিদিন ডিম দিও। দেখছোই তো তার শরীর খারাপ হয়ে গেছে। সাথে আমাকেও দিও। ডিম না খেলে শরীরে জোড় পাইনা। "
আমি কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর একটা বড় আর এফ এল এর গামলা নিয়ে হাজির হলাম।
" ও কান্তা তুমি এতবড় গামলা দিয়ে কি করবে! "
" আমি কিছু করবনা করবে তুমি। এখানে বসে বসে প্রতিদিন একটা করে ডিম পাড়বে। আর সেই ডিম দুই বাপ-বেটা মিলে খাবে। এখন এখানে বসে ডিম দেয়ার চেষ্টা কর। ডিমের বাজারে এখন আগুন তাই নিজের ডিমে নিজেরই চলতে হবে। নাও শুরু করে দাও। "
আমার কথা শুনে জামাই চোখমুখ উল্টিয়ে বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ল। অনেক কষ্টে কাঁদোকাঁদো হয়ে বলল, " ও কান্তা তুমি এসব কি বলছ? আমি ডিম পাড়ব কেমন করে! আমি কি হাঁস-মুরগি যে ডিম দিব! তাও মেয়ে হলে চেষ্টা করে দেখতাম। কিন্তু আমি তো পুরুষ। "
আমি অনেক কষ্টে হাসি চেপে রেখে বললাম, " আমার আব্বুর আসার কথা শুনে তুমি মুখ কালো করেছিলে। ভেবেছিলে অনেক খরচ হবে। আবার বাজার করার কথা শুনে হার্টবিট থেমে গেছিলো। ভেবেছিলে ডিম আমার আব্বুর জন্য কিনতে চাচ্ছিলাম। এদিকে আব্বুর হাই প্রেশার তিনি ডিম খাননা। নাও এবার ডিম দেয়ার চেষ্টা কর। "
" কান্তা ও কান্তা আমার ভুল হয়ে গেছে। এরকম ভুল জীবনে আর করবনা। আর কিপ্টামি করবনা
তোমার আব্বু আসলেও আর ভয় করবনা। "
আমি কথা না বলে শুয়ে পরলাম। একটিবারও ওর দিকে নজর দিলামনা। সে ঘ্যানঘ্যান করতেই থাকলো আর আমি কিছুক্ষণ পর ঘুমিয়ে গেলাম।
সকালে নাস্তার টেবিলে আসল সবাই। আমার জামাইটার মুখ আমচুনোর মত চিমসে গেছে।
আমার দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছেনা।
খাবারের দিকে চোখ পরতেই শ্বশুরের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কিন্তু তার ছেলের কোন প্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু চোখ দেখে মনে হল ভয় পেয়েছে!
" বউমা ডিম রেঁধেছ দেখছি! "
" হুম বাবা আজ ডিমের মামলেট,অমলেট, ডিমের কোর্মা, ডিম বিরিয়ানি, করলা দিয়ে ডিমের ঝোল, ডিমের দোপেয়াজা, ডিম ভাজি, মুলা দিয়ে ডিমের ঘন্ট, ডিম দিয়ে ডিমের ঝোল, ডিমের পায়েস, ডিমের সেমাই, নারকেল দিয়ে ডিম ভাজা সব আইটেমই করেছি। "
ওমা তাকিয়ে দেখি শ্বশুর বাবা চেয়ার থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে গোঁ গোঁ শব্দ করছে! আর জামাই দৌড়ে বেসিনে যেয়ে বমি করছে! শ্বাশুড়িমা আমার মত নির্বিকার চিত্তে দৃশ্যগুলো অবলোকন করছে।
সেদিনের পর থেকে জামাই আর ডিম মুখে তোলেনা। শ্বশুর বাবাও নিতান্তই বিপদে পরে একটা করে খায়।