মাঝরাতে হঠাৎ পাঁজরে দাবাং মার্কা লাথি খেয়ে ঘুমের মাঝেই কোৎ করে উঠলাম। এবং খাটের কিনারে শোবার সুবাদে ব্যালান্স রাখতে না পেরে ধপাস করে পরে গেলাম নিচে মেঝেতে। বাবাগো-মাগো বলে কোঁকাচ্ছি আর উজবুক জামাইকে ডাকছি আমাকে মেঝে থেকে উঠানোর জন্য। কোমরে এমন জোরে লেগেছে যে নিচ থেকে উঠতে পারছিনা। কিন্তু ব্যাটা উজবুক কুম্ভকর্ণের মত ঘুমিয়েই যাচ্ছে। মনে মনে হাজারটা গালি দিচ্ছি, "শালা তোর ঘুম জন্মের জন্য উঠে যাক, তোর ডায়রিয়া হোক, সর্দি সারা বছর থাকুক, নাকের ডগায় এসে উঁকি দিক জেলি।"
আমার বিয়ের বয়স দেড় বছর হতে চলল। এই দেড় বছরে প্রতি রাতেই এমন দুই-চারটা লাথি, কিল-ঘুষি খেতে খেতে শরীরে কালসিটে পরে গেছে। একবার ঘুমের ঘোরে এমন একটা ঘুষি দিয়েছিল যে তাতে নাক ফেটে গেছিল। রাগ করে লাথি-ঘুষি খাবার ভয়ে ডিভাইনে শুই। এমন ভাব করি যে তার উপর আমার ভিষণ রাগ। কিন্তু রাগ কম ভয় বেশি। অনেকবার তাকে বলেছি এমন করো কেন? সে বলে ঘুমের ঘোরে করে, এসব কিছুই বুঝতে পারেনা।
একবার হয়েছে কি জামাইয়ের বামপাশে শুয়েছি এবং আমার পাশেই ওয়াল মানে খাট ওয়ালের সাথে লাগোয়া। ঠিক মাঝরাতে ঘুমের ঘোরে বুঝলাম কেউ আছাড় মেরেছে পাথরের উপর। ব্যথায় কুঁকড়ে গেলাম। জেগে দেখি বলদটা আমাকে লাথি দিয়েছে আর আমি ছিঁটকে গেছি দেয়ালে। ফলশ্রুতিতে কপালে আলু গজিয়েছে। সেদিনের পর থেকে দেয়ালের দিকে জামাইয়ের বামপাশে শুইনা। শ্বশুর বাড়ির সবাইকে বলেছি তাদের ছেলের গুণের কথা। তারা বলেছে ছোটবেলার বদঅভ্যেস। তার সবসময়ই ইচ্ছে ছিল রেসলিং খেলোয়াড় হওয়ার। তাই ছোটবেলায় বালিশে মেরে প্র্যাকটিস করত। বড় হয়ে কোথাও কিছুদিন রেসলিং শিখতে গেছে। কিন্তু সুবিধা করতে না পারায় আর সেদিকে যায়নি । তাই নাকি ঘুমের ঘোরেই রেসলিং খেলে। এতসব চিন্তা করতে করতে গলা ফাটিয়ে তাকে ডাক দিলাম। সে লাফিয়ে উঠে আমাকে বিছানায় খুঁজতে লাগল। আমি রেগে বললাম, "এই যে বলদা আমি এখানে।"
সে মিনমিন করে বলল, "তুমি নিচে শুয়ে আছ কেন?"
আমি জবাব না দিয়ে বললাম, "আমাকে বিছানায় তোল।"
সে সুন্দরমত আমাকে কোলে নিয়ে বিছানায় রাখল। এতক্ষণে বুঝে গেছে আমি মেঝেতে কি করছিলাম। তাই আমাকে আর না ঘাঁটিয়ে অয়েন্টমেন্ট এনে যেখানে ব্যথা পেয়েছি সেখানে লাগিয়ে দিল। শুয়ে পরার আগে ইন্ডিয়া - পাকিস্তানের বর্ডার স্বরুপ কোলবালিশ দিয়ে নিলাম দুজনের মাঝে। দেখি কতক্ষণ নিরাপদে থাকি!
সকাল থেকেই চিন্তা করছি কিভাবে উজবুকটাকে শায়েস্তা করা যায়। অনেক ভেবে চিন্তে একটা বুদ্ধি পেলাম। আমাদের বাগানে কয়েকটা বড় পাথর দেখে আসছি বিয়ের পর থেকেই। কাজের মেয়েটাকে সাথে নিয়ে সবার চোখ এড়িয়ে অতিকষ্টে দুইটা পাথর রুমে এনে রাখলাম। রাতে যথারীতি জামাই ঘুমানোর পর খুব কষ্টেসৃষ্টে পাথর দুটো বিছানায় এমন পজিশনে রাখলাম যাতে জামাই লাথি-ঘুষি দিলে পাথরে লাগে। আর আমি খাটের কিনারে গুটিসুটি মেরে শুয়ে রইলাম। কখন ঘুমিয়েছি বুঝতে পারিনি। ঘুম ভাঙ্গলো বলদাটার ডাকে। চোখ গরম করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমিও ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে হাই তুলছি।
শেষে সে বলে উঠল, "আমি না হয় না জেনে ঘুমের ঘোরে কিসব করি, তাই বলে তুমি জেনে বুঝে এমন করবা?"
আমি কিছুই না বলে হাই তুলতে তুলতে ডিভাইনে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। সে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে পাথরগুলো নামিয়ে, হাতে সুন্দর করে পানিপট্টি বেঁধে শুয়ে গেল। আমাকে একবারও বিছানায় ডাকলনা! ব্যাটা উজবুক, বলদা। পরদিন আর আমার সাথে কথা বলেনি সারাদিন। আমিও চুপ। এভাবেই লাথিগুতার উপর দিয়ে চলছে আমার দিনকাল। তাকে শায়েস্তা করতে গেলে নিজেই ধরা খেয়ে বসে থাকি।
গ্রাম থেকে আমার চাচাত ভাই আর চাচি এসেছে চিকিৎসার জন্য। ঢাকায় কাছের বলতে আমিই থাকি। তাই ভরসা করে আমার শ্বশুর বাড়িতে উঠেছে। আমার শ্বাশুড়িও তাদের যথেষ্ট আপ্যায়ন করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো রাতে শোবার সময়। আমাদের বাড়িতে তিনটা শোবার ঘর। একটাতে আমরা, আরেকটাতে শ্বশুর - শ্বাশুড়ি এবং তৃতীয়টাতে আমার ননদিনী থাকে।
হঠাৎ করেই মাথায় বিজলিবাতি জ্বলে উঠল।
আমার ননদের রুমে আমি, চাচি আর ননদ মিলে শুলাম। জামাইয়ের কাছে দিলাম ভাইকে। আমিতো মনের সুখে বাক-বাকুম করতে করতে ঘুমিয়ে গেলাম। গভীর রাতে জামাই ব্যাটার চিৎকারে হুড়মুড়িয়ে উঠলাম। ততক্ষণে সবাই জেগে গেছে। জড়ো হয়েছে আমার রুমের দরজার সামনে। ডাকাডাকির এক পর্যায়ে দরজা খুলে বের হয়ে আসল জামাই। তাকে দেখে সবার চোখ কপালে!
চোখের নিচে কালসিটে, ডানগাল ফুলে আছে! মুখে রক্ত, পেটে হাত দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে! আরেক হাতের মুঠোয় একটা দাঁত! আমার শ্বাশুড়ি ছেলের অবস্থা দেখে হাউমাউ করে কাঁদছে। আমিও হতবাক! রুমে উঁকি দিয়ে দেখলাম ভাই অপরাধীর ন্যায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। জামাইকে নিয়ে ছুটলাম ডাক্তারের কাছে। চিকিৎসা শেষে বাসায় এসে জামাইকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল কিছুই জানেনা। ঘুমের মাঝেই আবিষ্কার করে আমার ভাই তাকে মারছে!
ভাই তখন বলল, "জামাই তার নাকে ঘুষি দিয়েছিল। আর সে তখন রেগে জামাইকে মারতে শুরু করে দেয়।"
আমি তখন সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললাম, "আসলে আমার ভাইয়ের একটা বদঅভ্যাস আছে । সে ঘুমালে কেউ তার শরীরে হাত দিলে সে ভীষণ রেগে যায়৷ তার ঘুম হালকা হবার জন্য কেউ তার শরীরে হাত দিলেই ঘুম ভেঙে যায়। আর তার ঘুম ভেঙে গেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকেনা। সামনে কে আছে সেটা তার মাথায় থাকেনা। একারণে ভাবি ভাইয়ের সাথে থাকেনা। ঘুমের মাঝে শরীরে হাত দেবার কারনে ভাই ভাবিকে পিটিয়েছিল তখন থেকেই ভাবি বাপের বাড়িতে। আজ আমার বিয়ের দশ বছর। সেদিনের পর থেকে আর রাত-বিরেতে জামাই লাথি-ঘুষি দেয়নি। আমিও শান্তিমত ঘুমাতে পারি। কি বুদ্ধিটাই না করেছিলাম সেদিন।